রমজান সামনে রেখে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেশের ছয় বড় আমদানিকারকসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রায় ১০ লাখ টনের বেশি নিত্যপণ্য নিয়ে অন্তত ৬০০টি লাইটার জাহাজ মাসের পর মাস নদী ও সাগরে আটকে রেখে সেগুলোকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে একদিকে তীব্র লাইটার সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রমজানে পণ্যের সরবরাহ কমে দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে রেকর্ড ১৭৬টি মাদার ভেসেল নোঙর করে রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬১টি জাহাজে গম, ভুট্টা, ছোলা ও সয়াবিনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য রয়েছে। বন্দর সূত্র জানায়, বহির্নোঙরে থাকা প্রায় ১১০টি মাদার ভেসেল বন্দরের ভেতরে না ঢুকে গভীর সমুদ্র থেকেই লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই পণ্য দীর্ঘদিন ধরে লাইটারেই আটকে রয়েছে।
ছয় আমদানিকারকের দখলে ভাসমান গুদাম
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আকিজ গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপসহ কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য নিয়ে অন্তত ৬০০টি লাইটার জাহাজ আটকে রেখেছে। এর মধ্যে আকিজ গ্রুপ একাই প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজে সার, বিটুমিন, সরিষা, ভোজ্যতেল, গম ও চিনি মজুত করে রেখেছে। নাবিল ও মেঘনা গ্রুপের অবস্থানও শীর্ষে রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে একটি লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে অনেক জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে নদী ও সাগরে ভাসমান গুদাম হয়ে আছে। ফলে নতুন পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় লাইটারের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
খালাসে ধীরগতি, বাড়ছে অপেক্ষা
বন্দর সূত্র জানায়, ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে ১০৮টি পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষমাণ ছিল, যেগুলোতে ৪৫ লাখ টনের বেশি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৭টি জাহাজে প্রায় ১২ লাখ টন রমজান সংশ্লিষ্ট খাদ্যপণ্য রয়েছে এবং আরও পাঁচটি জাহাজে দুই লাখ টনের বেশি চিনি বহন করা হচ্ছে।
লাইটার সংকটের কারণে যেখানে সাধারণত সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে একটি মাদার ভেসেল খালাস শেষ হওয়ার কথা, সেখানে এখন সেই সময় বেড়ে ২০ থেকে ৩০ দিনে দাঁড়িয়েছে। অনেক জাহাজ দিনের পর দিন কোনো পণ্যই খালাস করতে পারছে না।
কেন লাইটারেই গুদাম?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুদামে পণ্য নামালে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে মজুতের হিসাব স্পষ্ট থাকে। কিন্তু লাইটারে রাখলে সেই হিসাব সহজে পাওয়া যায় না। এতে চাহিদার সময় পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও দাম বাড়ানো সহজ হয়। ভাড়া করা গুদামের তুলনায় লাইটারে পণ্য রাখা তুলনামূলক কম খরচের হওয়ায় এই প্রবণতা গত এক দশক ধরে বাড়ছে।
সরকারের কড়া নির্দেশ
এই পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্যবোঝাই অবস্থায় থাকা লাইটার জাহাজ দ্রুত খালাসের কড়া নির্দেশ দিয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারী স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়েছে, আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য খালাস করে লাইটার জাহাজ ছেড়ে দিতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খুলনা ও ঢাকা অঞ্চলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে রমজান সামনে রেখে পণ্য মজুত ও দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে নিয়মিত মামলা ও জরিমানা করা হবে।
ইতোমধ্যে মুন্সিগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে দুটি লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারের দায়ে জরিমানা করেছে এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।







