স্বাধীনতা আন্দোলনের চরিত্র সরিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়: তানজীমউদ্দিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কারের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও স্মারক সরিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে প্রথম আলোর নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘বার্তাকক্ষে’ অংশ নিয়ে তিনি বলেন, দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস উপস্থাপনের এমন উদ্যোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেন এবং কোন নীতিমালার ভিত্তিতে সংগ্রহশালার এসব পরিবর্তন করা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও দাবি করেন তিনি।
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকসু সংগ্রহশালায় স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কোনো ছবি রাখা হয়নি। সেখানে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সালের আন্দোলন, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং রাজাকারদের তালিকার মতো বিষয়গুলো সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংস্কার শেষে রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা চালু হওয়ার পর সেখানে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
সোমবার দুপুরে আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান। পরে জিন্নাহর ছবির জায়গায় ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি লাগান বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা।
এ ঘটনায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় এমন ছবি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই বিজ্ঞপ্তির প্রসঙ্গে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, বিজ্ঞপ্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, এসব কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন ছিল না। তাঁর মতে, ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি অংশ এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রশাসনকে সহায়তা করার কথা। প্রশাসনের বিকল্প হিসেবে কাজ করা ডাকসুর দায়িত্ব নয়।
তিনি আরও বলেন, ডাকসু সংগ্রহশালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ। এর মালিকানা ডাকসুর নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তাই এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সিন্ডিকেটের।
‘শিক্ষকদের মূল্যায়ন ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত’
অনুষ্ঠানে ‘শিক্ষক মূল্যায়ন ও জিন্নাহর ছবি বিতর্কে ডাকসু’ বিষয়েও কথা বলেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়ন ও রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করাকে তিনি এখতিয়ারবহির্ভূত এবং ‘প্যারালাল প্রশাসন তৈরির চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন হলেও সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাঠামোর মধ্যেই হওয়া উচিত।
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়নের ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে, যা সাধারণত ‘স্টুডেন্টস ফিডব্যাক’ হিসেবে পরিচিত। শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক যুক্ত করা উচিত।
তিনি বলেন, শুধু চাকরির মেয়াদ, প্রকাশনার সংখ্যা, পিএইচডি বা অন্যান্য ডিগ্রির ভিত্তিতে একজন শিক্ষক তাঁর পেশাগত দায়িত্ব কতটা ভালোভাবে পালন করছেন, তা পুরোপুরি বোঝা যায় না। অনেক শিক্ষক ভালো গবেষক হলেও পাঠদানের ক্ষেত্রে দুর্বল হতে পারেন। আবার গবেষণা ও পাঠদান—দুই ক্ষেত্রেই ভালো করা শিক্ষকদের যথাযথভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সাল থেকে শিক্ষক মূল্যায়নের একটি ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু বিভাগে এটি চালুও হয়েছে। আইবিএ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে কাজ করেছে, তবে এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ডাকসুর উদ্যোগের বিষয়ে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, ডাকসুর নির্দিষ্ট গঠনকাঠামো ও কর্মকাণ্ডের পরিধি রয়েছে। শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা সেই এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, সেটিই প্রথম প্রশ্ন। তাঁর মতে, ডাকসু প্রশাসন নয়। তাই প্রশাসনের কাজ ডাকসু করতে গেলে ‘প্যারালাল প্রশাসন’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, ডাকসু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান হলেও এটি রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়। ডাকসুর সদস্যদের মতাদর্শগত অবস্থান রয়েছে, যার প্রতিফলন তাঁদের কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে। শিক্ষকদের মধ্যেও মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকায় ডাকসুর মাধ্যমে শিক্ষক মূল্যায়নে পক্ষপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষকদের নম্বর শিক্ষার্থীদের দেখার সুযোগ তৈরি হওয়া এবং পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে ‘প্রাইভেসির লঙ্ঘন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক জটিল হতে পারে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়া উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, ডাকসু নেতৃত্ব তৈরির এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। তবে ডাকসু যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে না পারে, তাহলে তা জাতীয় রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।