বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক নয়, বরং দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)।
সোমবার সকালে ভোলার সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
স্পিকার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। বাংলাদেশ এখন এমন সম্পর্ক চায় না।
তিনি বলেন, দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে সমমর্যাদার ভিত্তিতে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত, বাংলাদেশ সেটিই চায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব রাষ্ট্রের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করার আগ্রহ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে মূলত কূটনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে কথাবার্তা চলছে।
পতিত সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে তাঁকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ারও সমালোচনা করেন স্পিকার।
তিনি বলেন, এটি সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশেরও কিছু আপত্তি বা রিজার্ভেশন রয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলন নিয়েও মন্তব্য
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলন প্রসঙ্গেও কথা বলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
তিনি বলেন, বিগত সরকার বাংলাদেশকে ব্রিকসে যুক্ত করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেছিল। তবে অন্য পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন উৎসাহ দেখা যায়নি।
স্পিকারের দাবি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যথদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গত ১৭ বছরের দুঃশাসাযথ মর্যাদা দিয়ে ভারত আমন্ত্রণ জানায়নি।
‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গত ১৭ বছরের দুঃশাসনের ফলে দেশের প্রতিটি স্তর ও বিভাগে ধস নেমেছে।
তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম-খুন, মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বলেন, অতীতের বিভিন্ন রেকর্ড ভেঙে রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
বিগত সরকারের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে দেশকে পুনর্গঠন করতে সময় লাগবে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, সাত মাস এ কাজের জন্য খুবই অল্প সময়। তবে এরই মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’—সকালই দিবসের প্রতিচ্ছবি। আইনকানুনে বড় ধরনের সংস্কার আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সমঝোতার আশা
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে বলেও স্বীকার করেন স্পিকার। তিনি বলেন, কীভাবে সংস্কার কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পুরোপুরি একমত হতে পারেনি।
তবে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং নির্বাচনে বিরোধী দলের আসনে যারা বসবে, তারা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছরের বঞ্চনা ও দুঃশাসন থেকে জনগণ মুক্তি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই সংস্কার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও মন্তব্য করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদের আগামী অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দল সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে একমত হলে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আইনগতভাবে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত ফল দেখতে পাবে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়
এর আগে ভোলার সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
সভায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম নবী আলমগীর, জেলা প্রশাসক শামীম রহমান, পুলিশ সুপার শহীদুল্লাহ কাওসারসহ জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।