বিশেষ প্রতিনিধি
দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বাসাবাড়ির গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখনই পুরোপুরি কাটছে না। শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্পে বাড়ছে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ
সাম্প্রতিক তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছিল দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে। সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতেও পাঠানো হয়।
এ পরিস্থিতিতে শিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত থেকে কারখানাগুলোতে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা।
দুই মাস পর গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬১ কোটি ঘনফুটে।
এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে রিগ্যাসিফায়েড গ্যাস হিসেবে প্রায় ৯৯ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়েছে।
আগের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৬ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। এক দিনের ব্যবধানে সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট।
তবে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হওয়ায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ
সংকট মোকাবিলায় সরকার এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি মাসে বিভিন্ন উৎস থেকে কয়েকটি এলএনজি কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া অক্টোবর থেকে পরবর্তী জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে দুটি করে মোট ১৮টি এলএনজি কার্গো আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়মিত এলএনজি আমদানি এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি পরিচালিত হলে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুটে।
এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয় এবং গত দুই মাসে বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় লোডশেডিং হয়েছে।
চাহিদা ও উৎপাদনে এখনও বড় ব্যবধান
দেশে বিদ্যুতের দৈনিক সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক সময় উৎপাদন ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৯০৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৬ মেগাওয়াট। ফলে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি থেকে যায়।
বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ময়মনসিংহ, ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা ও সিলেট জোনেও উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং হয়েছে।
রাতারাতি স্বাভাবিক হবে না বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বাড়ছে এবং লোডশেডিংও ধীরে ধীরে কমছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিনে বা রাতারাতি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার ঘাটতি কমাতে হবে।
বাসাবাড়িতে স্বস্তি ফিরবে কবে?
শিল্পকারখানায় সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও আবাসিক খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
কারণ, দেশে গ্যাসের মোট চাহিদার তুলনায় বর্তমান সরবরাহ এখনও প্রায় ১১৯ কোটি ঘনফুট কম। ফলে শিল্পখাতে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়ার পর আবাসিক খাতে তাৎক্ষণিকভাবে পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করা কঠিন।
অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান এখনও উল্লেখযোগ্য।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত এলএনজি আমদানি, ভাসমান টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
অর্থাৎ শিল্পখাতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে পুরোপুরি স্বস্তি ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে। তবে ঠিক কবে নাগাদ লোডশেডিং ও আবাসিক গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

