ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: মৃত্যুর তথ্য যাচাই চলছে
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর যে তথ্য প্রচার হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত পৌনে ১১টার দিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্যের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোও যাচাই করা হচ্ছে।
একটি টেলিভিশনে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য প্রচারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, কোনো তথ্য নিশ্চিত না হয়ে প্রচার করা উচিত নয়। আগে তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে। নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে তালিকা তাঁকে দেখানো হয়েছে, সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নেই। তাঁর কাছে থাকা আরেকটি তালিকাও যাচাই করা হচ্ছে। মর্গের তথ্যও নেওয়া হয়েছে, তবে মর্গের তথ্যের সঙ্গে পাওয়া অন্য তথ্যের মিল নেই। সব তথ্য মিলিয়ে দেখার পরই প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রাত ১১টার দিকে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসানও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, বিভিন্ন তালিকা যাচাই করা হচ্ছে এবং যাঁদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য কীভাবে এসেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, গণমাধ্যম যেভাবে তথ্য পেয়েছে, তাঁরাও সেভাবেই শুনেছেন। এখন সেই তথ্য যাচাই করতে সরেজমিনে তদন্ত চলছে। তথ্য নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, সোমবার সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। খবর পাওয়ার প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার পর আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগায় ভবনের বিভিন্ন তলায় ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের পরিমাণ বড় না হলেও ধোঁয়া দেখে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হওয়ার অভিযোগ
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, আগুন ও ধোঁয়া দেখে রোগী ও স্বজনেরা আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় কয়েকজন আহত হন।
হাসপাতালে থাকা রোগী ও স্বজনদের কয়েকজনও সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাঁশবাড়ি কলোনির বাসিন্দা দুলাল মিয়া গত বুধবার তাঁর স্ত্রী জোসনা বেগমকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে তাঁর দুই মেয়ে ও তিন নাতনি আহত হন বলে জানান তিনি। পরে তাঁদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে নিচে নামতে পারেননি বলে জানান।
ফুলবাড়িয়ার সাথী বেগমও তাঁর বাবাকে সোমবার বিকেলে হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে সমস্যায় পড়েন। হাসপাতালের কয়েকটি সিঁড়ির ফটক বন্ধ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একটি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় অনেকে আহত হন বলে তাঁর দাবি।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে মৃত্যুর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন
অগ্নিকাণ্ডের পর সোমবার রাত ১০টার দিকে হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, জেলা প্রশাসক সাইফুর রহসান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বৈঠক করেন।
রাত সোয়া ১০টার দিকে তাঁরা বৈঠক শেষে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের বিভিন্ন তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি জানান কর্মকর্তারা।

